বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২০

পলাশবাড়ীতে দাদন ব্যবসায়ীদের খপ্পরে সর্বস্বান্ত সাধারণ মানুষ

ordinary people are lost in the clutches of Dadan traders

গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলায় দৈনিক কিস্তি থেকে শুরু করে চেক বন্ধক, সাপ্তাহিক ও মাসিক দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য যেন দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ব্যবসার কল্যাণে অনেকেই হয়েছেন ‘জিরো থেকে হিরো’।

দাদন ব্যবসায়ীদের খপ্পরে সর্বস্বান্ত সাধারণ মানুষ। শুধু কি তাই দাদনের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যাও করেছেন। আর এই সুদখোর দাদন ব্যবসায়ীদের কারণে সৃষ্টি হয়েছে সামাজিক অবক্ষয়।

কে রুখবে এদের প্রশ্ন উঠেছে সর্বমহলে। এদের নিকট জিম্মি হয়ে পড়েছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, রিকশাচালক থেকে শুরু করে শিক্ষক, ব্যবসায়ী এবং চাকুরিজীবি।

সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার প্রত্যন্ত পল্লী অঞ্চল থেকে শুরু করে হাট-বাজারে এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে শুধুমাত্র সাধারণ একটি পাশবহি’র মাধ্যমে একটি অফিস ঘর সৃষ্টি করে জমজমাট ভাবে দৈনিক কিস্তির ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যবসা এখন আর শুধু গ্রামের মধ্যেই সিমাবদ্ধ নেই।

এ ব্যবসা এখন শহরের বাসা-বাড়ী থেকে শুরু করে একটি দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে আবার কোথাও নাম সবর্স্ব সাইনবোর্ড এবং নামমাত্র সমিতি বা ক্লাব তৈরি করে প্রকাশ্যেই সুদ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন দাদন ব্যবসায়ীগণ। যার নেই কোনো সরকারি অনুমোদন।

ফলে সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষ। পৌরশহরসহ উপজেলার প্রত্যান্ত গ্রামাঞ্চলে অবৈধভাবে পুঁজি গড়ে তুলে দাদন ব্যবসা শুরু করেছে। এসব দাদন ব্যবসায়ীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ঘড়-বাড়ী, জমিজমা এমনকি নিজ বাড়ী ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে শতশত মানুষ। অনেকেই পাওনা দারের চাপে মানসম্মান বাঁচাতে আত্মহত্যার মতো পথও বেছে নিয়েছেন।

সম্প্রতি সুদের টাকার জন্য সাদুল্লাপুরে এক ইমাম আত্মহত্যা করে। ময়না তদন্ত রিপোর্টে আত্মহত্যা হলেও পরিবারের পক্ষ থেকে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমানে মামলাটি পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো পিবিআই তদন্ত করছে।

গত বৃহস্পতিবার সুদের টাকা দিতে না পেরে লজ্জায় ক্ষোভে আত্মহত্যা করেন পলাশবাড়ী পৌরশহরের মুসলিম উদ্দিন। আড়াই লক্ষ টাকার বিনিময়ে ৮ লক্ষ টাকার জমি দিতে হয়েছে তাকে।

বাবু নামে জনৈক্য ব্যক্তি তার নিকট সুদের টাকা পাওনা থাকায় টাকা পরিশোধের জন্য নিহত মুসলিমের উপর কঠোর চাপ প্রয়োগ করে আসছিলো। টাকা পরিশোধের কোন উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

দাদন ব্যবসায়ীদের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে ঘর, বাপদাদার জমি ও ট্রাক বিক্রি করে নিঃস্ব হয়েছেন পৌরশহরের বৈরী হরিণমারী গ্রামের সাজ্জাত মিয়া।

তিনি বিপদে পড়ে দাদন ব্যবসায়ীর নিকট কখনো দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক কিস্তির উপর টাকা নিয়ে নিজের সহায় সম্বল বিক্রি করে আজ নিঃস্ব অবস্থায় অন্যের জমিতে স্ত্রী, ছেলেদের নিয়ে বসবাস করছেন।

দুঃখজনক ঘটনা যে দাদন ব্যবসায়ীর নিকট টাকা নিয়েছিলেন সেই দাদন ব্যবসায়ীকে তার শেষ সম্বল থাকার জায়গা ঘরবাড়ি ও দাদনের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে লিখে দিতে হয়েছে।

অপরদিকে পৌরশহরের বৈরী হরিণমারী গ্রামের বিশিষ্ট কলা ব্যবসায়ী আনিছ তিনিও দাদনের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে বিক্রি করেছেন জমি। হারিয়েছেন মানসন্মান। বর্তমানে নিঃস্ব অবস্থায় দীর্ঘদিন থেকে বাড়ি থেকে রাগে ক্ষোভে চলে গেছেন বাহিরে।
আর এসব লোক দাদনের টাকার জন্য জমিজমা, গাড়ী-বাড়ি বিক্রি করার বিষয়ে অনেকেই জানে। তবে উল্লেখ্যযোগ্য বিষয় সুদখোর (দাদন ব্যবসায়ীদের) বিরুদ্ধে সরাসরি ভুক্তভোগীগণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিকট অভিযোগ না করার কারণ মানসন্মান ও হয়রানি।

তারপরও কি তাদের মানসন্মান রক্ষা হয়েছে! হয়নি। হবেও না? রাষ্ট্র যদি দাদন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শিঘ্রই পদক্ষেপ গ্রহণ না করতে পারে তাহলে আগামীতে শুধু সামাজিক অবক্ষয় নয়, ঘরে ঘরে দাদনের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী ক্ষোভের সঙ্গে এ প্রতিবেদক কে জানান, ব্যাংকে লোন নিতে গেলে ভাই দালালদের খপ্পরে পড়তে হয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের কে চেনেন না! তারা চেনেন দালাল কে? সেই সঙ্গে আজ নয় কাল করতে করতে চড়া সুদে দাদন ব্যবসায়ীদের নিকট টাকা নিয়ে ব্যবসা করতে হয়। তিনি সরাসরি ব্যবসায়ীদের কে দালাল এবং হয়রানি ছাড়া লোন দেওয়ার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সু-দৃষ্টি কামনা করেন।

পলাশবাড়ী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির উপদেষ্টা আলহাজ্ব একেএম মোকছেদ চৌধুরী বিদ্যুৎ এ প্রতিবেদককে জানান, দাদন ব্যবসায়ীদের বিষয়ে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিং-এ আলোচনা হয়েছে।

আমিও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। দাদন ব্যবসায়ীরা সমাজের শত্রু! এদের কারণে কয়েকদিন আগে পৌরশহরের প্রফেসর পাড়ায় মুসলিম নামে এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছেন।
যা অত্যান্ত দুঃখজনক। তিনি পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিং-এ দাদন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রস্তাব করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। তিনি আরও বলেন, দাদন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শিঘ্রই ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেন।

দাদন ব্যবসায়ীদের বিষয়ে পলাশবাড়ী প্রেসক্লাব সভাপতি ও উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য রবিউল হোসেন পাতা এ প্রতিবেদকে জানান, উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিং-এ দাদন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আজ অবধি দাদন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা তিনি জানেন না।

সচেতন অভিজ্ঞমহল বলছেন, দ্রুত জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে (সুদখোর) দাদন ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করে তাদের অবৈধ সম্পদ বাজোয়াপ্ত করাসহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সু-দৃষ্টি কামনা করেন। সেই সঙ্গে সব ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষকে সহজ শর্তে লোন দেওয়ার আহবান জানান ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নিকট।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

0Shares