বিশেষ প্রতিবেদনরংপুরসারাদেশ

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আগুনে পুড়ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সমাজ

আশরাফুল আলম, গাইবান্ধা প্রতিনিধি 

উনিশশত সাতচল্লিশ সালে দেশভাগের যন্ত্রনা ও নিরন্তর বেদনায় গৃহযুদ্ধের আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো। সেই আগুনের লেলিহান শিখায় মানুষ, ঘরবাড়ি, পশু, গ্রন্থ, পারিবারিক সম্পদ, মানুষের সভ্যতা, স্বাধীনতা, কৃষ্টি-কালচার পুড়ে ছাই হওয়ার উপক্রম হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কিন্তু কিছু মানুষের নিকৃষ্ট আক্রোশ যেন শেষ হয়েও হয়নি শেষ। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছর। কিন্তু আজও সেই সাতচল্লিশের অনুসারীরা স্বাধীন বাংলার প্রান্তরে নানা কৌশলে ঘুরছে। ভিন্ন ভিন্ন অপকৌশলে প্রশাসনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তাদের নাটক মঞ্চায়ন করে চলছে। ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত প্রত্যেকের নিকট ছাই চাপা আগুনের মতো একটু বাতাস দিলেই জ্বলে উঠতে সময় নেয় না।

ঘটনার শুরু যদিও অনেক দিনের। কারণ প্রায়শই এমন ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু এখন যে বিষয়টির বিরুদ্ধে সকল শ্রেণীর  মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং টেলিভিশনের পর্দায় টক অব দ্যা টকশো তা হলো ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতা’। এবারের ঘটনার শুরু ১৩ অক্টোবর ২০২১। এই দিনে দুর্গাপূজার অষ্টমীতে কুমিল্লার একটি মন্দিরে কথিত  ‘কোরআন অবমাননার’ অভিযোগ তুলে কয়েকটি মন্দিরে হামলা, ভাংচুর এবং পরে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৭০টি পূজামন্ডপে হামলা, গরু ছাগল ও দোকান লুট, বাড়ি-ঘরে আগুন ইত্যাদি ঘটনায় রীতিমতো আতংকিত অবস্থা। যদি কোন বিষয় নিয়ে অবমাননাকর কিছু ঘটে তবে আইনের আশ্রয় লাভের সুযোগ রয়েছে। আইনী ব্যবস্থার মাধ্যমে বিষয়টির নিস্পত্তি হতে পারতো অথবা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলন হতে পারতো কিন্তু লুটপাট আর বাড়ি পোড়ানো সঠিক পন্থা হতে পারে না। পথভ্রষ্ট দুরবৃত্তের এরকম আচরণ  ১৯৭১ এর সেই বিভিষীকাময় গল্পকে স্মরণ করায় যা একক জাতিসত্বায় আঘাতের সামিল। মাঝে মাঝে মনে হয় সেই হায়নাদের কোন বংশধর আবারও মাথা চাড়ায় উঠছে কি না!।

প্রতিটি যুদ্ধের ময়দানে ভালো খারাপ দুটো দলেই সক্রিয় থাকে। এই সুত্রে একটা বলাই যায়, আমাদের অনেকের তখন জম্মই হয়নি। তবুও ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে পুস্তক যা বলেছে তা হলো, ১৯৪৭ এ ভারত বিভক্তির ২৪ বছর পর হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের। আধুনিক, প্রগতিশীল, সম্প্রীতি, সমতা, সকলের জন্য ন্যায়বিচার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ও দর্শন নিয়ে যাত্রা শুরু করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। কিন্ত অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় তা হলো স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আজও দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বিদ্যমান। এখনও কিছু মানুষ সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রদর্শন ও চিন্তা-চেতনা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। কিছু চিহ্নিত উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী গুজবের চর্চায় ভাইরাল হয়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে অধর্ম করতেও তাদের কল্যাণে বাধে না।

ঘটনা বুঝে ওঠার আগেই অশুভ শক্তির দাপটে নষ্ট করা হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং উৎসবের আমেজ। ঘটনার পরম্পরায় একে একে ভাংচুর করা হলো ধর্মীয় অনুভুতির আয়না। আগুন, লাঠি আর দায়ের কোপে গুড়িয়ে দেয়া হলো ধর্মীয় উৎসবের প্রতীক। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের বক্তব্য অনুযায়ী এবারের দুর্গাপূজায় দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন দিনে ৭০টি পূজামণ্ডপে হামলা, ঘরবাড়ি ভাংচুর অগ্নিসংযোগ, গরু ছাগল এবং দোকান লুটের ঘটনা ঘটেছে। দেশের অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার ওপর এটা একটা বড় আঘাত। ঘটনাসমূহের প্রতিবাদে দেশ বিদেশে রাষ্ট্রের ভাবমুর্তি আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, এলাকার জনপ্রতিনিধিগণের যথাযথ উদ্যোগ ও যথেষ্ঠ পূর্বপ্রস্তুতি থাকা সত্বেও এ ধরণের ঘটনা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধে তাদের ব্যার্থতা, দুর্বলতা ও অক্ষমতাকেই প্রকাশ করে।  ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বিবৃতি দিয়ে হিন্দুদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলা বন্ধ এবং অপরাধীদের খুঁজে বের করতে নিরপেক্ষ তদন্তের আহবানও জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঘটনার প্রতিবাদে রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছেন। প্রায় ৭০টির মতো পূজামন্ডপে হামলার ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে আখ্যা দিলে তা রাষ্ট্র এবং সমাজে লুকিয়ে থাকা দুর্বৃত্তায়নকে উৎসাহিত করা হবে।

মুসলিম খ্রিস্টান ইয়াহুদি হিন্দু ও বৌদ্ধ সবাই মানুষ হিসেবে এক জাতির অন্তর্ভূক্ত। হজরত আদম ও হাওয়া আলাইহিস সালামের সন্তান হিসেবে আল্লাহর কাছে সব মানুষের অধিকার ও মর্যাদা সমান। কোনো ধর্মই কারো ওপর জোর-জবরদস্তিকে সমর্থন করে না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ইসলামের আদর্শ সুমহান। সব ধর্মের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করেছে ইসলাম। ধর্ম পালনে কেউ কাউকে বাঁধা দেবে না। অন্য ধর্ম নিয়ে কেউ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা যাবে না মর্মেও কোরআনে আয়াত নাজিল হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর আদর্শ ছিল তুলনাহীন। তিনি ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠী বিচারে তিনি করো প্রতি জুলুম করেননি। কারো প্রতি অবিচার করেননি। আবার কারো প্রতি জুলুম-অবিচার করাও পছন্দ করেননি। অমুসলিমদের প্রতি বিশ্বনবীর আচরণ ও মানসিকতায় তা ফুটে ওঠেছে। এখান থেকে আমাদের শিক্ষা লাভের সুযোগ সবসমই আছে।

একটা বিষয় আমাদের চিন্তা করতে হবে ধর্মের নামে এদেশে এ রকম সংঘবদ্ধ গুজবিক অপরাধ এটাই প্রথম নয়। সুতরাং এই অবস্থা নিয়ন্ত্রনে আমাদের কে কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরী। অনেক স্থানে দেখা যায়, সহজ সরল মানুষ গোষ্ঠি দ্বন্দ অথবা সামাজিক দ্বন্দের কারনে বা অন্য কোন কারনে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কোন ঝুঁকির চিন্তা না করেই ধর্ম পালনের উপাসনাস্থল প্রস্তুত করে সেখানে স্বস্ব ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন করে। ফলে নিরাপত্তার বিষয়টি অজানাই রয়ে যায়। এরই ফাকে একে অপরের সামান্য আক্রোশে বৃহৎ দ্বন্দের সৃষ্টি হয় এবং পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাহিরে চলে যায়। কোন কোন সময় খুনের ঘটনাও ঘটে। তাই প্রত্যেকটি ধর্মীয় উপাসনালয় প্রস্তুতের ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া বিধান জারি করতে পারলে ভলো। প্রশাসনের নিকট সকল উপাসনালয়ের নিদ্দিষ্ট তালিকা থাকলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠের চোখ দিয়ে দেখলে সংখ্যালঘুর মন বোঝা যায় না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ঈদের আনন্দের সময় বাড়ি-ঘর পাহাড়া দিতে  শহর জুরে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীর দ্বারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। পক্ষান্তরে হিন্দু কিংবা অন্যান্য ধর্মানুসারীদের উৎসবের বেলায় নিরাপত্তার বিষয়ে বৈষম্য বিদ্যমান। এটির নিরসন ঘটাতে হবে। ক্ষণে ক্ষণে রক্ত ঝড়া বন্ধ করতে হবে। কারণ সংবিধানে আনন্দ কিংবা বিনোদনের অধিকার সকল নাগরিকের জন্য সমান।

সাম্প্রদায়িক সমাজ রক্ষার জন্য ভয় ও শংঙ্কামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে নিজ দেশের সংস্কৃতি-চেতনায় উদ্ভাসিত মানুষ তৈরি করা খুব জরুরি। অতীতের মতো এবারের ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করে রাজনীতির প্রলেপ দিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা চলছে। ফলে প্রকৃত অপরাধী এর ফয়দা লুটছে। যেকোন ঘটনাকে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির কালচারে না রেখে সঠিক অপরাধী চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে হয়তো এর সুফল পেলেও পাওয়া যেতে পারে। গুজব আর কুসংস্কার মিশ্রিত ধার্মিক মানুষ হওয়ার চেয়ে মানবিক এবং প্রকৃত ধর্মপ্রাণ ভালো মানুষ হওয়া যথেষ্ট নিরাপদ। মানবিক ও সহিষ্ণু মানুষ সৃষ্টির মাধ্যমেই স্বাধীনতার ফসলের উপর সকলের অধিকার বহলাংশে প্রতিষ্ঠিত হবে।

এই জাতীয় আরো খবর

Back to top button